চীনের মহাপ্রাচীরের রহস্য

Spread the love

The mystery of the Great Wall of China

মানব প্রকৌশলের এক অন্যতম নিদর্শন হল চীনের মহাপ্রাচীর। এ প্রাচীন বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ মানব সৃষ্ট স্থাপনা। মহাপ্রাচীরের সম্মিলিত দৈর্ঘ্য পৃথিবীর বিষুব রেখার দৈর্ঘ্যর অর্ধেকেরও বেশি। অতীতের এই সামরিক প্রতিরক্ষার স্থাপনা আজ বিশ্ব ঐতিহ্য ও চীনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকে জানবো পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে এক চীনের মহাপ্রাচীর সম্পর্কে।

চীনের মহাপ্রাচীর বলতে কোন একক প্রাচীর কে বোঝায় না। চীনের বিভিন্ন রাজবংশের আমলে তৈরি প্রাচীর গুলো কে একত্রে দ্য গ্রেট ওয়াল অফ চায়না বলা হয়। উত্তর চীনের প্রায় ১৫ টি অঞ্চল জুড়ে মহাপ্রাচীরের অবস্থান। এ মহাপ্রাচীর মানুষের হাতে তৈরি পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ স্থাপনা। মহাপ্রাচীরের সবচেয়ে প্রাচীন অংশ ২৭০০ বছরের পুরনো।

The mystery of the Great Wall of China

খ্রিস্টপূর্ব ৭৭০থেকে২৭৬ সালের মধ্যে প্রথম এইসব প্রাচীর নির্মাণ করা হয় এবং সর্বশেষে এই প্রাচীর নির্মাণ কাজ চলে ১৮৭৮ সালে কিং রাজবংশের আমলে। এত বড় একটা স্থাপনা তৈরি করা হয়েছিল এক গুজবের ওপরে ভিত্তি করে । সম্রাট কিং সি হওঙ খ্রিস্টপূর্ব ২২১ সালে সমগ্র মধ্যে চিন একত্রিত করে কিন সাম্রাজ্য গড়ে তুলেন। কিন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই বেশ কিছু ছোট ছোট রাজ্য শত্রুদের আক্রমণ প্রতিহত করতে ছোট ছোট প্রাচীর নির্মাণ করেছিল। সম্রাট কিন রাজ্য জয়ের পর এক জাদুঘর তাকে বলেছিল উত্তরে যাযাবরেরা একদিন সম্রাট কিনিকে ক্ষমতাচ্যুত করবে। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে সম্রাট আশেপাশে রাজ্যগুলিতে ছোট ছোট প্রাচীর গুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি করার আদেশ দেয়। খ্রিস্টপূর্ব ২২০থেকে ২০০সালের মধ্যবর্তী সময় দেওয়াল গুলির মধ্যে সংযোগ সাধন করা হয়। আর তখনই চীনের ছোট ছোট প্রাচীর গুলি মহাপ্রাচীরের আকার ধারণ করে এবং সেই প্রাচীরের খুব সামান্যই এখনো অবশিষ্ট আছে।

বর্তমানে প্রাচীরের যেসব অংশ দেখা যায় অধিকাংশই মিং রাজবংশের শাসন আমলে নির্মিত হয়। ১৩৮১ সালে মিং রাজবংশের প্রাচীর নির্মাণ শুরু করে। তারা প্রায় ৮,৮৫১ কিলোমিটার প্রাচীর তৈরি করতে সক্ষম হয়। এস প্রাচীর নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল চীনের উত্তর সীমান্ত বই শত্রুদের আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেতে। কোন কোন ক্ষেত্রে ২ বা ৩ শারি দেওয়াল তুলে প্রাচীরের সে উদ্দেশ্য সফল করা হয়েছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মহাপ্রাচীরের নির্মাণে অবদান রেখেছে চীনের ২০ টি রাজবংশ। এ সব রাজবংশের শাসনা আমলে বিভিন্ন ধাপে পুনর্নির্মাণ মেরামত ইত্যাদি করা হয়। এ সামরিক অবকাঠামো তৈরিতে ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষকে জোর করে কাজ করানো হয়। সৈনিক, সাধারণ শ্রমিক, জনতা এবং সাজাপ্রাপ্ত আসামিদেরকে প্রধানত শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

The mystery of the Great Wall of China

এ প্রাচীর তৈরি করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা যায়। তাদের অনেককেই এই দেয়ালের মধ্যেই সমাহিত করা হয়। তাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্থাপনা দীর্ঘ মানব সমাধী হিসেবেও বিবেচিত করা হয়। এ প্রাচীর সাংহাই পাস থেকে শুরু হয়ে লকনু নামক স্থানে গিয়ে শেষ হয়েছে। কয়েক হাজার বছরের বেশি সময় ধরে নিমৃত বিভিন্ন স্থানের প্রাচীন সম্মিলিত দৈর্ঘ্য প্রায় ২১,১৯৬ কিলোমিটার যা পৃথিবীর বিষুবরেখার দৈর্ঘ্যের অর্ধেক থেকেও বেশি।বিষুব রেখার দৈর্ঘ্য হলো ৪০হাজার কিলোমিটার। এ প্রাচীরের উচ্চতা প্রায়২০ ফুট এবং সর্বোচ্চ উচ্চতা প্রায় ৪৬ফুট।

ভৌগলিক ভাবে প্রাচীন এর অবস্থান এর উচ্চতা বেশ তারতম্য রয়েছে। বিভিন্ন উঁচু-নিচু অঞ্চল মিলে প্রাচীরগুলো তৈরি করা হয়েছিল। প্রাচীরের সর্বনিম্ন অবস্থান প্রায় সমুদ্র পৃষ্ঠ বরাবর এবং সর্বোচ্চ অবস্থান ৪৭২২ ফুট। চীনের মহাপ্রাচীরের গড় প্রস্থ প্রায় সাড়ে ২১ফুট। একে প্রাচীর বলা হলেও এই স্থাপনাটি সাধারণ কোন প্রাচীন নয়। বিভিন্ন দুর্গ, সেনানিবাস, অন্তরীণ পথ সহ এবং চলাচলের সুবিধাজনক অবকাঠামো কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছিল এটি। একদিকে তিব্বত অন্যদিকে চীন সাগরের প্রাকৃতিক বাধা দীর্ঘ দিন ধরে বাইরের আক্রমণ থেকে প্রতিহত করেছে। কিন্তু চীনের উত্তর দিকটা ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত তাই উত্তরের হান উপজাতিদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসাবে এই দেয়াল তৈরি করা হয়।

The mystery of the Great Wall of China

শত্রুদের প্রতিহত করতে এটি তন্ত কার্যকরী হিসাবে দেখা দেয়।কিন্তু সব সময় এই প্রাচীর চীনের বহিঃশত্ররুদের আটকে রাখতে পারেনি। এ দেওয়াল ছোট ছোট বহু আক্রমণ ঠেকাতে সক্ষম হলেও চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বাধীন মঙ্গল বাহিনী ১৩ শতকের মহা প্রাচীর ভেদ করতে সক্ষম হয়। যাদের কে আটকাতেই মহাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছিল তারাই পরবর্তীতে ১০০বছর প্রাচীর এর নিয়ন্ত্রণ করে। দেওয়াল টিতে নিয়মিত বিরতিতে বিভিন্ন চৌকি রয়েছে। এইসব চৌকিতে অস্ত্র সংরক্ষণ, সেনাবাহিনীর আবাসন এবং ধোঁয়ার সংকেত প্রদানের ব্যবহৃত হতো । এছাড়াও এই দেওয়াল কে ঘিরে দীর্ঘ বিরতিতে এবং সেনাঘাঁটি এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল।  শত্রুদের অবস্থান জানার জন্য চৌকি ছাড়াও পাহাড়ের উঁচু জায়গায় সংকেত টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছিল।

বর্তমানে চীনের মহাপ্রাচীরের যে সমস্ত অংশটি কে আছে অধিকাংশই মিং রাজবংশের আমলে তৈরি। উচু উচু পর্যবেক্ষন দুর্গ গুলো সেই সময় নির্মাণ করা হয়। অনেকে বলে থাকে চাঁদ থেকেও দেখা যায় কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও সত্যি নয়। এমনকি পৃথিবীর নিম্নকক্ষ পথ থেকে ও খালি চোখে এই প্রাচীর দেখা যায় না। একটু চুলকে যেমন ৩ কিলোমিটার দূর থেকে খালি চোখে দেখা সম্ভব নয় ঠিক তেমনি এই মহাপ্রাচির কেউ মহাকাশ থেকেও খালি চোখে দেখা যায় না। তবে বিশেষ দূরবীনের সাহায্যে মহাকাশ থেকে চীনের প্রাচীর দেখা যায়।

যে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছিল বিদেশীদের প্রবেশ ঠেকাতে সেই প্রাচীরই এখন অসংখ্য বিদেশী কে টেনে আনছে। প্রতিবছর দেশি-বিদেশি পাঁচ কোটিরও বেশি লোক চীনের মহাপ্রাচীর ভ্রমণ করতে আছে। প্রাচীরের সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশের নাম হল বাডালিং। বেজিং থেকে ৭০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বাডালিং এর প্রাচীর সর্বোচ্চ মানের সংরক্ষিত রয়েছে।

আধুনিককালে প্রায় সাড়ে চার শতাধিক রাস্ট্র প্রধান চীনের প্রাচীর পরিদর্শন করেন। তার মধ্যে শুধু এই বাডলিং অংশের শফর করতে পেয়েছেন প্রায় ৩০০ জন রাষ্ট্রনেতা। চীনের প্রাচীরের সবচেয়ে ব্যস্ততম অংশ এটি। এই অংশের প্রাচীন নিয়মিত সংস্কার করা হয়। তবে বাডালিং য়ের আশেপাশের অংশের দেওয়াল গুলি খুব একটা ভালো নয় সেজন্য ওইসব জায়গায় পর্যটককে যেতে না বলা হয়।

The mystery of the Great Wall of China

চীনের মহাপ্রাচীরের তিন ভাগের এক ভাগ অংশ প্রাকৃতিকভাবেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। বেজিং সহ অন্যান্য পর্যতন কেন্দ্রগুলি নিকটস্থ প্রাচীর গুলি মেরামত করা হয়েছে। উত্তর পশ্চিমে গাংস এবং নি়ংজিয়া প্রদেশের প্রাচীর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে এখানকার সবচেয়ে বেশি প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধারণা করা হয় প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট কারণে এই দুই প্রদেশের প্রাচীর সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তবে সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে চীনের প্রাচীরের ক্ষতি হয় হাজার ১৯৭০ দশকের চলা চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়। তখন দেওয়ালের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের পাথর ব্যবহার করে রাস্তাঘাট সব বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি মেরামত করা হয়। ৯০ দশক পর্যন্ত অনেক অসাধু লোক এই পাথর চুরি করে বিক্রি করতে থাকে। এই সময় বিপুল পরিমান পাথর এখান থেকে না সরানো হলে এই প্রাচীরে অনেক অংশই আজ অক্ষত থাকতো।

২০০৬ সালে এই মহাপ্রাচীর কঠোর আইন হওয়ার পর থেকে এরকম অবৈধ ব্যবসা অনেকটাই  কমে গেছে। বর্তমানে চীনের বিভিন্ন অংশে অনেক পরিকাঠামো তৈরি ক্ষেত্রেই পাথর ব্যবহার করা হয়।


Spread the love

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *