পঙ্গপালের আক্রমণ

Spread the love

Locust attack

ঘাসফড়িং এর সমগোত্রীয় একটি প্রাণী পঙ্গপাল। এই পতঙ্গ বিশাল বিশাল ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ করে মাঠের পর মাঠ ফসল উজাড় করে ফেলে। ১০ লাখ পতঙ্গের একটি ঝাঁক একদিনে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের খাবার খেয়ে ফেলতে পারে। আজকে পর্বে আমরা আলোচনা করব পঙ্গপাল কি এবং এরা কিভাবে আক্রমণ করে থাকে ফসলের উপর।

Locust attack
পৃথিবীর প্রাণী জগতের মধ্যে অত্যন্ত বিস্ময়কর এক আচরণ পঙ্গপাল এর ঝাঁক। পৃথিবীতে অন্য কোন প্রাণী পঙ্গপালের মত এত বড় দলে এবং এত দ্রুত  আবির্ভূত হয় না। পঙ্গপাল এবং ঘাসফড়িং এর মধ্যে পার্থক্য হল ঘাসফড়িং একাকী বসবাস করে, আর পঙ্গপাল অবস্থান করে ঝাকে ঝাকে।

Locust attack

একক পঙ্গপাল কে ইংলিশে বলা হয় Locust আর এদের ঝাঁক কে বলা হয় Locust swarm.  একা থাকা কালিন পঙ্গপাল কৃষির জন্য তেমন ক্ষতিকর নয়। তবে বিশেষ বিশেষ কিছু প্রাকৃতিক পরিবেশে পঙ্গপালের আচরণগত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এবং তখন তারা মারাত্মক ক্ষতিকর পতঙ্গের পরিণত হয়। পঙ্গপালের মস্তিষ্কের বিশেষ পরিবর্তনের ফলে তারা অতি দ্রুত বহুসংখ্যক সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম এবং ধীরে ধীরে সামান্য থেকে বিশাল দল গড়ে তুলে। পঙ্গপালের সংখ্যা অসংখ্য রূপে বৃদ্ধি পেলে এদের মধ্যে উড়ে বেড়ানোর পবিত্তি জাগে। তখন তারা খাদ্য শস্যের গন্ধ সুকে নতুন নতুন খাবারের সন্ধান খুঁজে বের করে। যতক্ষণ কোন এলাকার খাদ্য শস্য আছে ততক্ষণ এরা টিকে থাকে। কোন একটি এলাকার খাদ্যশস্য শেষ হয়ে গেলে পোকাগুলি নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে অতি দ্রুত সেই এলাকা ত্যাগ করে।

Locust attack

পঙ্গপালের উপদ্রব ঠেকাতে এখনো পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি। মাটিতে পঙ্গপালের ডিম দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে। এমনকি কুড়ি বছর পরেও মাটিতে পড়ে থাকা পঙ্গপালের ডিম থেকে বাচ্চা হতে পারে। বাচ্চা পঙ্গপাল উড়তে পারেনা অল্প বয়সের এই পতঙ্গ গুলি লাফিয়ে লাফিয়ে চলে। সাধারণতঃ একটি বাচ্চা পূর্ণবয়স্ক হতে প্রায় চার সপ্তাহ সময় লাগে। পূর্ণ বয়স্ক হওয়ার পর তাদের শারীরিক গঠন খুব দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে।

Locust attack

একটি প্রাপ্তবয়স্ক পঙ্গপাল প্রতিদিন তার নিজের ওজনের সমান খাওয়ার খেয়ে ফেলতে পারে। আর পঙ্গপালের একটি ঝাঁক একদিনে হাজার হাজার টন খাদ্যশস্য খেয়ে ফেলতে পারে। এইসব পোকা প্রতিনিয়ত দলগতভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। যাতাযাত এর সময় পঙ্গপাল নিজের দেহের শক্তি সঞ্চয় করে বাতাসের উপর ভর করে এগিয়ে চলে। বাতাসের গতি পথ অনুসরণ করে চলার ফলে বাতাস যেদিকে যায় পঙ্গপাল ও সেদিকে আক্রমণ করে। এক একটি পঙ্গপালের ঝাঁক তাদের যাত্রা পথে আরো নতুন নতুন ঝাঁকের সাথে মিলিত হয়। এবং কয়েকটি বড় বড় ঝাঁক একত্রিত হয়ে আরো অতিকায় ঝাঁক তৈরি করে। এসব অতিকায় ঝাঁকে কয়েক বিলিয়ন পঙ্গপাল থাকতে পারে।

Locust attack

অতি বৃহৎ একেকটি পঙ্গপালের ঝাঁক প্রায় ৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। আর প্রতি কিলোমিটারে ঝাকে ৭ থেকে ৮ কোটি পতঙ্গ থাকতে পারে। এ বিশাল পঙ্গপালের দল চলার পথে খাওয়ার উপযোগী সকল কিছু সাবাড় করে যায়। পঙ্গপালের আক্রমণে কোন অঞ্চলে কৃষি ব্যবস্থায় মারাত্মক ধস নামতে পারে। এসব পতঙ্গ কোন এলাকায় আক্রমণ করলে সেখানকার কোন গাছের পাতা ও অবশিষ্ট থাকে না।

Locust attack

গত বছর হর্ন অফ আফ্রিকা দেশগুলোতেও স্বাভাবিকের চেয়ে চারগুণ বেশি পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে ২০১৯ সালের শেষে এবং ২০২০ সালের শুরুর দিকে পঙ্গপালের ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটেছে। এ সময়ের মধ্যে সোমালিয়া এবং ইথিওপিয়ায় ১২ হাজার হেক্টর এবং কেনিয়ার প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমি ফসল ধ্বংস করেছে এই পঙ্গপাল। এই পঙ্গপাল গুলো ইথিওপিয়ায় ও সোমালিয়ার মরুভূমিতে উৎপন্ন হয় – কেনিয়া, জিবিউটি, উগান্ডা সহ এর আশেপাশে অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। পঙ্গপাল আক্রান্ত অঞ্চলে হেলিকপ্টার ও বিমান থেকে কীটনাশক ছিটিএও এদের দমন করা যাচ্ছে না ।

Locust attack

এ ছাড়া প্রায় একই সময়ে মরুভূমির পঙ্গপাল পাকিস্তানের আক্রমণ করেছে। ২০১৯ সালের মার্চে পাকিস্থানে প্রথম বারের মতো পঙ্গপালের আক্রমণে সিন্ধু,দক্ষিণ পাঞ্জাব এর প্রায় নয় লক্ষ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। সম্প্রতি পাকিস্তানের আক্রমণ কারী পঙ্গপাল ভারতীয় ঢুকে পড়েছে। কেনিয়া এবং পাকিস্তানের ও ভারতে পঙ্গপালের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।

Locust attack

জাতিসংঘের আশঙ্কায় এদের ঠেকাতে না পারলে জুন নাগাদ তাদের সংখ্যা ৫০০ গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে আফ্রিকার ৩০টি দেশে এই পতঙ্গ ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে বিশ্বের প্রায় কুড়ি শতাংশ ফসলি জমি এই পঙ্গপাল এ আক্রান্ত হবে। এর ফলে পৃথিবীর ১০ ভাগের এক ভাগ মানুষ বেঁচে থাকার মত খাবারের অভাব দেখা দেবে।

 


Spread the love

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *