করোনাভাইরাস কিভাবে আক্রমণ করে

Spread the love

বর্তমানে সমগ্র বিশ্বের মানুষ অতি ক্ষুদ্র একটি ভাইরাসের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। ভাইরাসটির নাম sars cov-2 সাধারণ লোক জান একে করোনা ভাইরাস নামেই চেনে। এই ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট রোগ কে বলা হয covid-19। করোনা ভাইরাসের ব্যাস মাত্র ১২০ ন্যানোমিটার। ভাইরাসটি এতই ক্ষুদ্র যে শুধুমাত্র বৈদ্যুতিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে এদেরকে দেখা সম্ভব। বৈদ্যুতিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে তোলা ছবিতে করোনা ভাইরাস কে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ গুণ বড় করে দেখানো হয়েছে। এতই ক্ষুদ্রই এই করোনা ভাইরাস -মানব দেহে কিভাবে আক্রমণ করে তা জানব আজকের এই পর্বে।

ভাইরাস সাধারণত একাকী অবস্থা অর্ধমৃত থাকে। এগুলো শুধুমাত্র কোন জীবন্ত কোষে প্রবেশ করলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিভিন্ন উপায় ভাইরাস মানুষ অথবা প্রাণীর দেহে প্রবেশ করতে পারে। বহু ভাইরাস আছে যেগুলো পশুপাখির শরীর থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

সাধারণত এক ধরনের প্রাণীর ভাইরাস অন্য প্রাণীর শরীরে সংক্রমিত হয় না। কিন্তু কখনও কখনও ভাইরাস বিবর্তনের মাধ্যমে অন্য প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করার যোগ্যতা অর্জন করে। কোন একটি প্রাণীর শরীর থেকে ভাইরাস যখন অন্য প্রাণীর শরীরে আক্রমণ করতে সক্ষম হয় তখন তাকে বলে spillover ইনফেকশন। প্রথমে করোনাভাইরাস ও spillover ইনফেকশন এর মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে। তবে ঠিক কোন প্রাণীর শরীর থেকে নোবেল করোনাভাইরাস মানুষের দেহে প্রবেশ করেছে তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে।

কোন ভাইরাস মানুষের শরীরে একবার প্রবেশ করার পর ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষের ছড়িয়েছে। কোন আক্রান্ত ব্যক্তি যখন অন্য কারো সংস্পর্শে আছে তখন হাঁচি ,কাশি বা কথা বলার সময় ছিটকে আসা জলকণা থেকে করোনার জীবাণু ছড়াতে পারে। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির স্পর্শ করা কোন বস্তু থেকেও ভাইরাসটি অন্য কারো হাতে চলে যেতে পারে। ওই হাতের সাথে লেগে থাকা ভাইরাস চোখ, নাক ও মুখ সর্প করার মাধ্যমে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। ভাইরাস আমাদের দেহে প্রবেশ করার পরপরই শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে করোনা ভাইরাস বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে আমাদের ফুসফুসে।


ভাইরাস গুলো এদের দেহের বাইরে থাকা প্রোটিনের কাঁটার সাহায্যে মানব কোষে প্রবেশ করে। অনেকটা চাবি দিয়ে তালা খোলার মত তারা আমাদের কোষের ভিতরে ঢুকে যায়।এই প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে ভাইরাস এর ভিতরে থাকা আর.এন.এ . বা রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড। সেই আর. এন .এ. ই ভাইরাসের জেনেটিক কোড বহন করে। যার ফলে ভাইরাস নিজেদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে মানবদেহে ক্ষতি করতে পারে। মানবদেহে ঢোকার পর ভাইরাসের আর.এন.এ. কোষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

কি অবস্থা আমাদের দেহের কোষগুলো ভাইরাসের কথা মতো কাজ করতে থাকে। তখন ভাইরাসের প্রথম কাজ হলো ক্রমাগত তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা।একটি কোষের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ভাইরাস উৎপন্ন হলে একপর্যায়ে সেই কোস টি গলে যায়। এবং অসংখ্য ভাইরাস অন্য কোষগুলোকে আক্রমণ করে। এভাবে ১ থেকে ১০ দিনের মধ্যে লক্ষ-কোটি ভাইরাস ফুসফুসের দখল নিয়ে নেয়। তখন এইসব ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করতে শুরু করে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর উপাদান গুলির বিরুদ্ধে লড়াই করে শরীরকে সুস্থ করে তোলাই রোগপ্রতিরোধ কোষের প্রধান কাজ।যেহেতু করোনাভাইরাস ফুসফুসে সবথেকে বেশী ক্ষতি করে তাই বিপুল পরিমাণ রোগ প্রতিরোধোক কোন ফুসফুসে প্রবেশ করে। কিন্তু তখন ভাইরাসগুলো আমাদের রোগপ্রতিরোধী কোশেও আক্রমণ করে তখনই ঘটে সবচেয়ে বড় বিপত্তি। ভাইরাস এর দ্বারা ইমন সেল আক্রান্ত হওয়ার ফলে উপকারী এই কোষগুলো দিশেহারা হয়ে পড়ে। তখন আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বুঝে উঠতে পারেনা আর কোনটি ক্ষতিকর কোষ আর কোনটি উপকারী। এর ফলে আমাদের ইমিউন সিস্টেম অসুস্থ কোষগুলোর পাশাপাশি বহু সুস্থ কোশ ও মেরে ফেলে।

এক পর্যায়ে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সকল অসুস্থ কোশ এবং ভাইরাস মেরে ফেলতে সক্ষম হয়। এবং এই পর্যায়ে সাধারণত বেশিরভাগ করুন আক্রান্ত রোগী সুস্থ হয়ে উঠে। তবে প্রত্যেক ব্যক্তির শরীর অবস্থা যেহেতু আলাদা তাই ব্যক্তি ভেদে সুস্থ হতে এক থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য জ্বর ,কাশি ও শ্বাসকষ্টের মত সমস্যা দেখা দেয়।কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এই ভাইরাস ঝুঁকিপূর্ণ অথবা অত্যন্ত জটিল সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে ফুসফুসের প্রচুর পরিমাণ কোষ নষ্ট হয়ে যায় তখন ফুসফুস আর ঠিকমতো কাজ করে উঠতে পারে না। এর ফলে রোগীর তীব্র শ্বাসকষ্ট অনুভব করে।তখন রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে ভেন্টিলেশনে মাধ্যমে অক্সিজেন দিতে সাহায্য করা হয়।

কিন্তু এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে রোগ-প্রতিরোধক্ষমতা ভাইরাসের বিরুদ্ধে পুরোদমে যুদ্ধ করার ফলে শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সমস্ত শরীরেই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে যায়। এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রয়োজনের তুলনায় অধিক শক্তি ব্যয় করার কারনে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিজেদের দেহের বেশি ক্ষতি করে।এ ধরনের পরিস্থিতিতে রোগীর মারা যাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি হয়ে যায়। এছাড়া ফুসফুসে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পৌঁছাতে না পারার কারণে অনেক রোগীর তীব্র শ্বাসকষ্টে মারা যায়।

জীবনঘাতী করোনাভাইরাস কে পরাজিত করতে ভ্যাকসিন বা টিকা আবিষ্কারে চেষ্টা চলছে। গবেষকরা ইতিমধ্যেই ভাইরাসের জেনেটিক কোড উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছে। এর মাধ্যমে ভাইরাসটির দুর্বলতা খুঁজে বের করা হচ্ছে। একাধিক গবেষণায় কিছু সফলতা ও পাওয়া গেছে।এই জেনেটিক কোডের মাধ্যমে গবেষণাগারে ভাইরাসের অনুরূপ প্রোটিন তৈরি করা হচ্ছে। সেসব প্রোটিনে করোনা ভাইরাসের দেহের সবকিছুই থাকে শুধু সেই ক্ষতিকর আর.এন.এ .ছাড়া। এসব প্রোটিন ভাইরাসের প্রোটিনের কাটার বিরুদ্ধে লড়াই করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুজনের শরীরে এমন ভ্যাকসিন প্রবেশ করানো হয়েছে। এই ভ্যাকসিন ভাইরাসকে বাইরে থেকে সিল করে দেয়।তার ফলে ভাইরাস আর নতুন করে কোন কোষের ভেতর ঢুকে ক্ষতি করতে পারে না। তবে রাতারাতি কোনো পূর্ণাঙ্গ ভ্যাকসিন তৈরি করা সম্ভব নয়। গবেষকরা বলছেন শতভাগ কার্যকরী ভ্যাকসিন বাজারে আনতে ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লাগবে।

ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আগে এই ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকতে আমাদেরকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। কিছুক্ষণ পর পর হাত ধুতে হবে, বারবার নিজেদের মুখমণ্ডল স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। দূরত্ব বজায় রাখার প্রধান উদ্দেশ্য হলো আমরা নিজেরা যেন ভাইরাস আক্রান্ত না হই এবং আমাদের থেকে অন্য কারো কাছে ভাইরাস ছড়িয়ে না পড়ে। করোনা ভাইরাস এর প্রথম লক্ষনগুলো প্রকাশ পেলে রোগ পরীক্ষা করার চেষ্টা করুন। এবং পার্শ্ববর্তী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।


Spread the love

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *