আন্দিজ পর্বতমালার ইতিহাস

Spread the love

 History of the Andes Mountains

দক্ষিণ আমেরিকায় অবস্থিত একটি বিশাল পর্বতমালা আন্দিজ। আন্দিজ শুধু একটি পর্বতমালা নয় এটি পর্বতমালার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। বহু পার্বত্য অঞ্চল একসাথে সম্পৃক্ত হয়ে এই পর্বতমালা গড়ে ওঠার কারণে এখানে রয়েছে অভাবনীয় সব প্রাকৃতিক বৈচিত্র। আজকে আমরা আলোচনা করবো পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম ও বৈচিত্র্যময় পার্বত্য অঞ্চল আন্দিজ পর্বতমালা সম্পর্কে।

 History of the Andes Mountains

দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় সম্পূর্ণ পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত আন্দিজ পর্বতমালা। ধারণা করা হয় প্রায় ৫ কোটি বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকা ও প্রশান্ত টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষের ফলে এই পর্বতমালার সৃষ্টি হয়েছে। আন্দিজ পর্বতমালার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭২৪২ কিলোমিটার। আর অন্য কোথাও এত দীর্ঘ পাহাড়ের সারি দেখতে পাওয়া যায় না। তাই এই পর্বতমালা পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম পর্বতমালা হিসেবে বিবেচিত করা হয়। এই পর্বতমালা প্রস্থ প্রায় ৮০০ কিলোমিটার। এবং আন্দিজের গড় উচ্চতা প্রায় ১৩ হাজার ফুট। আন্দিজ পর্বতমালার চেয়ে উঁচু একমাত্র পার্বত্য অঞ্চল হল হিমালয় পর্বতমালা।

 History of the Andes Mountains

পৃথিবীর শীর্ষ পর্বত শৃঙ্গের অধিকাংশ এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত। আর এশিয়ার পর্বত গুলোর পরেই সবচেয়ে বড় পর্বত আকোনকান্ডয়া এই আন্দিজ পর্বতমালার অংশ। আর্জেন্টিনা অবস্থিত আকোনকান্ডয়া পর্বতমালা উচ্চতা প্রায় ২২৮৪১ ফুট। পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম এই পর্বতমালা দক্ষিণ আমেরিকা ৭ টি দেশ জুড়ে অবস্থিত। ভেনিজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, পেরু, বলিভিয়া, চিলি এবং আর্জেন্টিনা মধ্যে আন্দিজ পর্বতমালার অংশ রয়েছে।

দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের থাকা এই পার্বত্য অঞ্চল বহু বৈচিত্রে সমৃদ্ধ। আন্দিজের দৈর্ঘ্য বরাবর পর্বতমালা টি কয়েকটি ধাপে বিভক্ত। এই মহাদেশ ও প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে আন্দিজ পর্বতমালা এক বিশাল দেওয়াল হিসাবে কাজ করে। সে কারণে দক্ষিণ আমেরিকার জলবায়ুর উপর আন্দিজ পর্বতমালা অসাধারণ প্রভাব পড়ে। শুধু এই পর্বতমালা জুড়ে তিনটি পৃথক জলবায়ু অঞ্চল রয়েছে। অঞ্চল গুলো হল ক্রান্তীয় আন্দিজ, আর্দ্র আন্দিজ ও শুষ্ক আন্দিজ। পর্বতমালার উত্তরের অংশ সাধারণত উষ্ণ এবং বৃষ্টিবহুল। এবং দক্ষিণভাগ ও মধ্যভাগ পশ্চিম দিকের আবহাওয়া অনেকটা অনেকটাই আর্দ্র । পর্বতমালায় পশ্চিমদিকে আতাকামা মরুভূমি সংলগ্ন অঞ্চলের আবহাওয়া খুবই শুষ্ক।

 History of the Andes Mountains

পৃথিবীর ক্রান্তীয় অঞ্চলে ৯৯ ভাগই হিমবাহ এই আন্দিজ পর্বতমালায় রয়েছে। যদিও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ধীরে ধীরে এই বরফ গলে শেষ হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ আগ্নেয়গিরি ও এই আন্দিজ পর্বতমালা তে অবস্থিত। চিলি ও আর্জেন্টিনার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত ওহোজ দেল সালাদো হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। এই আগ্নেয়গিরির উচ্চতা ২২৬১৫ ফুট । এই আগ্নেয় পর্বত দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত। অর্থাৎ আকোনকান্ডয়া পর্বত এর পরেই এর অবস্থান। এছাড়াও ১৯ হাজার ফুটের বেশি উচ্চতার উপন্যস পঞ্চাশটিরও বেশি আগ্নেয়গিরি আছে আন্দিজ পর্বতমালার জুড়ে। বলতে গেলে এই পর্বতমালায় বেশি পর্বত শৃঙ্গ হল আগ্নেয়গিরি। এখানকার একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দ্বীপগুলো ও আন্দিজ পর্বতমালার অংশ। এই দুধগুলো মূলত আন্দিজ পর্বতমালার নিমজ্জিত পাহাড়ের চূড়া।

 History of the Andes Mountains

প্রাচীনকালে আন্দিজ পর্বতমালায় মানব বসতির খুব আলামত পাওয়া যায় না। তবে এখানে সবচেয়ে পুরনো মানববসতি চিহ্ন অনুসারে ধারণা করা যায় প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার বছর আগে মানুষ আনন্দে যে বসবাস করত। গবেষকদের ধারণা আরো আগে এখানে মানুষ বাস করলেও তাদের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি ও এত উঁচুতে অক্সিজেনের স্বল্পতা ও কঠিন পার্বত্য পরিবেশ মনুষ্য বসবাসের অনুউপযোগী। তারপরও অতীতের পাহাড়ে পশুপালন সমাজের লোকেরা প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় নিজেদেরকে মানিয়ে নিয়েছিল।

বিগত ১৫ শতকে পেরুর অন্তর্গত আন্দিজ অঞ্চলে উঠেছিল ইনকা সভ্যতা। এই সাভ্যতার একটি অনবদ্য সৃষ্টি দুর্গনগরী মাচুপিচু। ইনকা সভ্যতা সম্বন্ধে এই বস যখন কেন্দ্রটি বিশ্বের নতুন সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে অন্যতম একটি। আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চলের দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বহু বিখ্যাত শহর গড়ে উঠেছে। এই পর্বতমালায় থাকা উল্লেখযোগ্য শহর গুলো হল পেরুর হোয়ারেজ এবং কোস্কো। ইকুয়েডরের কুইটো ও বানস,বলিভিয়ার লাপাজ, কলম্বিয়ার বোগোটা ও মেডিলিন, চিলির পুয়েত নাতালেস।

 History of the Andes Mountains

আন্দিজ পর্বতমালায় বহু খনিজ পদার্থের মজুদ আছে। পেরুতে অবস্থিত ইয়ানা কোচা পৃথিবীর বৃহত্তম একটি সোনার খনি। এছাড়া আন্দিজ পর্বতমালায় লক্ষ লক্ষ মেট্রিক টন তামা ও রুপা মজুদ আছে। পৃথিবীর দীর্ঘতম দ্বিতীয় নদী আমাজন পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়েছে। আন্দিজ পর্বতমালার জীববৈচিত্র্য অন্যতম। এখানে প্রায় ৩০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ,১৭০০ প্রজাতির পাখি, ১০০০ প্রজাতির উভচর, ৬০০ স্তন্যপায়ী একই সংখ্যক প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৪০০ প্রজাতির মাছ রয়েছে।

আন্দিজ অঞ্চলে প্রাণীরা এই কঠিন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য অভিযোজিত হয়ে উঠেছে। এখানকার মজার ব্যাপার হলো উটের সমগোত্রীয় একাধিক প্রাণী এখানে রয়েছে। উটের সমগোত্রীয় প্রাণী গুলি হল লামা, আলপাকাএবং ভিকুনি। আন্দিজের সবচেয়ে আলোচিত গাছ হল কোকা। এই কোকা গাছের পাতা থেকেই কোকেন এর মত মাদক তৈরি করা হয়।

 History of the Andes Mountains

পাহাড়ি উচ্চতাজনিত শারীরিক সমস্যা এবং অবসাদ দূর করতে সমগ্র আন্দিজ পর্বত অঞ্চলে মানুষ বহু আগে থেকেই কোকা চা পান করে আসছেন। এই পাহাড়ের আর এক বিশেষ গাছ হলো সিনচোনা পিউবাসেন্স। এই গাছ থেকে কুইনিন প্রস্তুত করা হয়। অত্যন্ত তিক্ত স্বাদ যুক্ত কুইনিন ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে, জ্বর কমাতে একটি কার্যকরী ঔষধ।

এখানে আরো একটি আলোচিত জায়গা হল সালার দি ইউনি। এখানকার এই চমকপ্রদ প্রাকৃতিক অঞ্চল বিশ্বের সর্ববৃহৎ লবণ সমভূমি। অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের কাছে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই জায়গাটি।


Spread the love

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *