সুন্দরবনের মরিচ ঝাঁপির ইতিহাস

Spread the love

১.  আইজ্ঞা বাবু আমি মরিচঝাঁপি থেইকা কইতাছিলাম! বাবু আমি সুরেন মণ্ডলের ভূত। গুলি খাইয়া মইরা ভূত অইছি। এখনো এইহানে ঘুইরা বেড়াই। মাটিতে রক্তের গন্ধ পাই আইজও! কান্দনের শব্দ হুনি। মনে আছে কারো আমাগো কথা ?  মরিচঝাঁপির কথা মনে নাই ?

          ৪৭এ দ্যাশভাগের সময় আমরা এইহানে পলাইয়া আইছিলাম। হিন্দু আর মোছলমানের লাইগা আলাদা দ্যাশ হইব! আমরা পোত্থমে কইছিলাম বাপ-দাদার ভিটা ছাইড়া কুনহানে যামু না। পরে দেহি না গেলে এইহানে তো আমাগোরে জানে মাইরা ফেলব। নেহেরু কইল- ‘কোনো ভয় নাই, তোমরা এইহানে আইয়া পড়। এই দেশ তুমাগের।’ তা নেহেরু না কইলেও না আইয়া উপায় আছিল না! মুসলমানের পাকিস্তানে হিন্দুগো জায়গা অইবো না হেইডা আগেই বুঝা গেছিল। নোয়াখালী কুমিল্লা চাঁদপুর ঢাকায় হিন্দুগো কাইট্টা ভাসায়া দিল- তা কি আর আফনেগো অজানা বাবু? এইহানে না আইলে আমরা যামু কোই? আইতে অইলই! আমাগো গেরামের মণীন্দ্র মুখার্জি, জমিদার আছিল! তারেও দেখছিলাম শিয়ালদা স্টেশনে মাথার তলে বোঁচকা রাইখা শুইয়া আছে! আমি দেইখ্যা কাইন্দা ফালাইছিলাম- ‘বাবু, এ কি অইল?’ বাবু কিছু কইতে পারেন না। হা কইরা চাইয়াছিলেন খালি। এইরকম কত মণীন্দ্র জমিদার বাপ-ঠাকুরদার জমিদারী থুইয়া আফনেগো এইহানে ভিখারী অইছে সে খবর কি আফনেরা রাখসেন? আমার মত সুরেন মন্ডলের কথা ছাইড়াই দিলাম!

[২] দেশভাগের আগে আগে অনেকেই আইয়া কোলিকাতাতে বাড়িঘর-টর করছিল। আমরার কি সে সামর্থ্য আছিল? আমরা ভাবছিলাম- আমার দ্যাশ, নিজের দ্যাশ, যত যাই হউক, থাইক্যা যামু। পারিনাই বাবু! প্রাণের মায়া বড় মায়া! সব ছাইড়া আইয়া গেসি। বাঘাবাঘা জমিদার থাহে নাই ডরে, আমরা কেনে থাহি? দ্যাশে আমাগেরে মাইনষে কইল- হিন্দুগো লাইগা হিন্দুস্থান আর মোছলমানগো লাইগা পাকিস্তান অইসে- এইহানে কুনো হিন্দু থাকব না! দ্যাশের নেতারা এই সিদ্ধান্ত লইয়া দ্যাশ স্বাধীন করছে। আমরা না মাইনা কি করুম? তয় দ্যাশের মাডির টান আর মায়ের নাড়ীর টান একই লাগে বাবু। অনেক কষ্টে ছাড়ছিলাম। এই দ্যাশে আইতে গিয়া ভাবছিলাম- হাজার হউক হিন্দুগো দ্যাশ- খারাপ থাকুম না, ভালাই থাকুম। মনেরে কত কিছু বুঝাইলাম। কিন্তু আসলেই কি ভালা থাকতে পারছিলাম? আমাগো গেরামে আমি আছিলাম পোস্ট অফিসের পিয়ন! আমার বাড়ি আছিল ফরিদপুরে বাবু। মাসে মাসে ভাল ট্যাহা পাইতাম। এইহানে আইয়া আমি কুলিগিরি করছি বাবু শিয়ালদায়, বাবু প্যাডের জ্বালায় ভিখও মাগছি- কইতে লজ্জা নাই! হিন্দু বইলা কেউ ডাইকা আইনা দুইডা ভাত খাওয়াইনাই তো! পোত্থম পোত্থম বাঙাল কইত, পরে পরে কইত রিফিউজি, আগে করুণা দেহাইতো, পরে পরে চিড়িয়াখানার জানোয়ার ভাবত, একসময় আমরা খালি রিফিউজি নামে একটা আলাদা জাত অইয়া গেলাম! গরীবের কুনো ধর্ম পরিচয় অয় না বাবু! গরীব গরীবই! যার প্যাডে ভাত নাই হে ধর্ম-টর্ম দিয়া কি করব? মনে করছিলাম হিন্দুগো হিন্দুস্থানে হিন্দু অইয়া সুখেই থাকমু- কিন্তু পরিস্থিতি অন্যরকম দেখসিলাম! শখে দ্যাশ ছাড়িনাই বাবু! কেউ এইহানে কুলিগিরি করতে বাপের ধানীজমি থুইয়া আহে নাই! আফনেরা শিক্ষিত মানুষ, আফনেরাই কন।


[৩] এই দ্যাশে সরকার আমাগোরে কইল- তোমরার এইহানে থাকবার কষ্ট অইত্যাছে দেইখ্যা আমরা তুমরার লাইগা কিছু বাড়ি ঘর বানাইত্যাছি, তোমরা অইহানে থাকবা। আমরারে ট্রাকে ট্রাকে কইরা গরু ছাগলের মত কইরা কোথায় কোথায় যে লইয়া গেল বাবু অত জাগার নামও জানি না! আমি আছিলাম দণ্ডকারণ্য! জঙ্গল-টঙ্গলে কিছু বাড়ি টাড়ি বানাইয়া দিসিলো আমরারে! ওইহানে দম বন্ধ অইয়া আইত বাবু। পশুর মত লাগত নিজেরে! মনে অইত এ কি খাঁচার মধ্যে জীবন পালতাসি! তহনো বিয়া করিনাই। তাই চিন্তাও কম আছিল। ভাবতাম কপালে মরণ যদি এইভাবেই থাহে তো কি আর করার আছে? মরতে তো অইবোই! আমার লগে আমাগো এলাকারই এক লেখাপড়া জানা পোলার খুব ভাব অইছিল। সে কইতো, বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানরা নাকি ইহুদিগো এইরকম কইরা আলাদা বাড়িঘর কইরা রাইখা দিত! দ্যাশবিদেশের কত্ত কথা জানত পোলাডা! সে ওইহানে ম্যালেরিয়ায় মইরা যায়। পোলাডার চেহারা মনে পড়লে বুকের ভিত্রে মোচড় মারে বাবু। কুলিগিরি, লেবারগিরি কইরা অইহানেই আমি কাডাইয়া দিসিলাম ৩০ বছর। বিয়া-সংসার আর করি নাই! ক্যামনে করমু কন? তয় একডা মাইয়ারে দেইখ্যা মনে খুব সাধ জাগছিল! একদিন হুনলাম হে আর নাই! কোথায় গেছে কেউ জানে না। সংসারের চিন্তাও সেই একবারের মত মাথায় আইয়া এক্কেবারের মতই বিদায়!


[৪] ৭৫ সালের পরে কুনু এক সময় হুনলাম কোলিকাতায় কারা নাকি কইসে আমাগোরে তারা আবার অইহানে ফিরাইয়া লইয়া যাইতে চায়! কি বামপন্থী না কি একটা দল জানি কইল! হেরা আমাগো দন্ডকারণ্যে রিফিউজি ক্যাম্পে আইসা আমাগোরে কইল- ‘তোমরার কোনো চিন্তা নাই, সুখের দিন আইতাছে, তোমরা আবার বাংলায় ফিরতে পারবা।’ আফনেগোরে বুঝাইয়া কইতা পারমু না বাবু- হেইদিন আনন্দে আমাগো কি দশা অইছিল! মনে অইতাছিল- এইবার আমাগো লাইগা সত্যিই দ্যাশ স্বাধীন অইতাছে! কিন্তু স্বপ্ন স্বপ্ন স্বপ্নই থাইকা গেল বাবু! আশায় বুক বাঁধছিলাম বাংলায় যামু। হেই বাম না টাম, অত কি আর বুঝি, হেরাই সরকারে গেছিল, ক্ষমতা লইয়াই কইল, আমাগোরে আইতে দিব না আর! তাইলে আগে মিছা কথা কইসিলি ক্যান? রাগে দুঃখে যন্ত্রণায় মাথার ঠিক আছিল না আমাগো। আমরা ঠিক করলাম- এইবার যা কিছু একডা অইবোই অইব! আমরা লাখের ওপর রিফিউজি, আমরাও বাঙালী, আমরাও হিন্দু- আমরা এই জঙ্গলে ক্যান বাঁচমু? আমরা কি মানুষ না? আমরা ঠিক করলাম- আমরা বাংলাতেই যামু- দেখি ক্যামনে কেডা আটকায়!


[৫] হেরা অনেক বাধা দিল। পারল না বাবু! বাঙালের জোর কিসে হ্যা তো আফনেরা জানেন। তার ওপর এত্তগুলান মানুষ! আটকান কি এত সোজা! তয় আমরারে শর্ত দিল, আমরারে শহরে থাকতে দিব না, আমরারে সুন্দরবনে গিয়া থাকন লাগব! আমরাও চিন্তা কইরা দেখলাম- দণ্ডকারণ্য ক্যাম্প থাইকা তো ভালা! তারপর কইল হেরা আমরারে কুনো সরকারী সাহায্য দেয়া অইব না! আমরাও কইলাম বাবু সমস্যা নাই- আমরা নিজের খাওন নিজেই জুটাইতে জানি! এডাই সিদ্ধান্ত অইল। দেখলাম সবাই রাজি না। অনেকেই দণ্ডকারণ্যেই ফিরা গেল। যারা যাইতে চায় তাগোরে আটকামু ক্যান? তারা গেল। আমরা তবু হাজার হাজার, মনে করেন চল্লিশ পঞ্চাশ হাজার মানুষ তবু রইয়া গেলাম। যেডাই থাক কপালে- এইহানেই থাকমু। আমরা সুন্দরবনের এই মরিচঝাঁপিতেই আইয়া পড়লাম বাবু। নিজেরা ঘর বাঁধলাম। মাছ ধইরা খাইতাম। টুকটাক এইডা সেইডা কইয়া প্যাড চালাইতাম। সরকারের থাইকা কিছু লওন লাগত না। সরকারের কথাও হুনোন লাগত না। এইডাই আমাগো কাল অইছিল! এই দ্বীপে আমাগোরে থাকনের কথা হ্যারাই কইছিল। ভাবছিল আমরা না খাইয়া মইরা যামু। তারপর এমনিতেই এইহান থাইকা আবার পলামু সবাই। কিন্তু আমরা তা করি নাই। আমরা দেহাইছিলাম বাঙাল কি করতে পারে। হেইডা তাগো সহ্য অইল না বাবু। একদিন তারা আমাগোর সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ কইরা দিল। আমাগোর খাওনের পানি নাই, খাওন নাই, কিচ্ছু নাই। সব তারা বন্ধ কইরা দিল বাবু। আমরা না খাইয়া মরতে লাগলাম! কেউ কেউ ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পাইরা গলায় ফাঁস দিল! তাতেও সরকারের মনের রাগ মিটে না। পুরা মরিচঝাঁপি দ্বীপ সরকারের পুলিশ লঞ্চে কইরা ঘিইর্যা রাখতো যাতে আমরা পলাইতে না পারি। পলাইতে দেখলে গুলি কইরা মাইরা নদীতে লাশ ডুবাইয়া দিতো! কোন পত্রপত্রিকার লোক আইতে দিত না বাবু। পুরা মরিচঝাঁপিতে কার্ফ্যু কইরা দিসিলো! আমাগো মাছের ঘর, নৌকা, জাল সব জ্বালাইয়া দিল পুলিশ আর সরকারী গুন্ডারা! আমাগো মাইয়াগোরে লইয়া গিয়া ইজ্জত লুটত! গেরামের সব ক্ষেতিজমি উজাড় কইরা দিল। পানির টিউবওয়েল যত্তডি আছিল সব ভাইঙ্গা দিল। একদিন গেরামের জওয়ান পোলারা পানি আনতে সাঁতার দিসিলো বাবু- গাঙ্গের পানিতে আইজও তাদের রক্ত ভাসতে দেহি! লাল লাল রক্ত! আমাগো দুধের বাইচ্চা চোখের সামনে না খাইয়া মইরা গেছে- এমন কত্ত দেখসি বাবু! কইতে এই ভুতের গায়েও রক্ত আইসা পড়ে! আমরা নাকি সুন্দরবন নষ্ট করতাসি! আমরা নাকি এইহানে থাইকা পাকিস্তানের অইয়া যুদ্ধ করার টেরেনিং করতাসি! এইসব কইতে কইতে একদিন আইয়া তারা আমরার ওপর পাখির মারার মতন কইরা গুলি চালাইলো বাবু! ওইপারে ৭১ সণে পাকিস্তানের গুলি খাইয়া যারা এইহানে আইছিল তারা কয়- এরাও নাকি এইরকমই করসে! অভাগা পদ্মাপাড়ের মানুষ- তোরা কি মানুষ না? তোগোর কি ভগবান নাই? সইতে পারতাসিলাম না বাবু। দাওখান লইয়া উঠানে আইয়া খাড়াইসিলাম। গুলিডা তলপ্যাডে আইয়া লাগছিল! তারপর- আইজ অব্দি ভূত অইয়া ঘুরতাসি! আইজও গাঙ্গের জলের লাশ চোখে জাইগা ওডে! আইজও ইজ্জত হারানি মাইয়াগুলার মুখ দেখি! চিক্কুর শুনি! আইজও দেখি স্বপন মাঝির উঢানে লাশের গাদা! উঢানে থকথকে রক্ত! বাবু কয় হাজার রিফিউজি মারসিলো আমরার এই মরিচঝাঁপিতে হেই খবর কি আফনেরা রাখসিলেন? রাখেন নাই! রাখার দরকারও মনে করেন নাই হয়ত! মানবতার বহুত বুলি মনে রাখেন, সময় পাইলে মাইনষেরে হুনাইয়া দেন, বামপন্থা, সাম্যবাদের কথা কন, কত মানুষের বুকে কতটা কইরা গুলি খরচা করছিলেন হেইডা তো কন না!

১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে শুরু উৎখাতের প্রথম পর্যায়। ২৪ জানুয়ারি থেকে শুরু হলো অর্থনৈতিক অবরোধ। ৩০টি লঞ্চ অধিগ্রহণ করে মরিচঝাঁপিকে ঘিরে ফেললো জ্যোতি বসুর পুলিশ। সংবাদমাধ্যমের জন্য জারি হলো ১৪৪ ধারা, মরিচঝাঁপি তাদের জন্য অগম্য এবং নিষিদ্ধ। এ নিয়ে কিছু লেখা যাবে না, বলাও যাবে না। রিফ্যুজিদের টিউবওয়েল থেকে শুরু করে ক্ষেতিজমি, মাছের ঘের, নৌকা সব নষ্ট করে ফেলা হলো। বৃষ্টির জল ধরে রেখে তা পান করে প্রাণ বাচানো চেষ্টা করছিলো তারা, সেখানে বিষ মেশানো হলো। সে বিষে মরলো অসংখ্য শিশু। বাইরে থেকে খাবার আনার জো নেই, রসদ পাওয়ার জো নেই। ৩১ জানুয়ারি কিছু মরিয়া যুবক পাশের কুমীরমারি থেকে খাবার আনতে সাঁতরে ব্যারিকেড ভাঙলো। পুলিশের গুলিতে মরতে হলো তাদের ৩৬ জনকে। মানুষ ততদিনে বাঁচার জন্য ঘাস খেতে শুরু করেছে!

বিপন্ন এই মানবিকতায় উদ্বিগ্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গের যারাই সাহায্যের হাত বাড়াতে উদ্যোগী হয়েছেন, তাদের সে হাত ঠেকিয়ে দিয়েছে বামফ্রন্ট। সরকারী এবং দলীয় তরফে। জগদ্দরদী মাদার তেরেসা পর্যন্ত জানালেন, আক্রান্ত মরিচঝাঁপিতে কিছু করতে তিনি অপারগ! সাহায্যপ্রার্থী সুব্রত চ্যাটার্জিকে বললেন, সর্যি উই কান্ট গো, নাইদার উই কান এক্সপ্লেইন হোয়াই উই কান্ট…। এদিকে অনাহারে মরতে শুরু করেছে মানুষ। যা-তা খেয়ে অসুখে মরছে শিশু এবং বৃদ্ধরা। গুলিতে যাদের মারা হচ্ছে, তাদের লাশ নগদে গুম করে ফেলা হচ্ছে। হয় লঞ্চে তুলে জলে ফেলে দেওয়া হচ্ছে, নয়তো ডাম্প করা হচ্ছে টাইগার প্রজেক্টে। বাঘের আহার জোগাতে। জ্যোতি বসু ওদিকে সংবাদ মাধ্যমে বলে চলেছেন- সুন্দরবনে এসব উদ্বাস্তু আসলে সিআইএর চক্রান্ত বাস্তবায়ন করছে, তারা সশস্ত্র ট্রেনিং নিচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে লোক এসে এখানে আশ্রয় নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে অন্তর্ঘাত ঘটানোর ষড়যন্ত্র করছে বলে তার কাছে পাকা খবর আছে।

মে মাসের শুরুতে যাকে বলে ফাইনাল অ্যাসল্ট। কাহিনীটা খতম করার সিদ্ধান্ত নিলেন জ্যোতি বসু। পুলিশের হাত শক্ত করতে যোগ দিলো সিপিএম ক্যাডাররা। পার্টির নির্দেশ বলে কথা! আশেপাশের দ্বীপগুলোতে কঠোর আদেশ জারি হলো- এতদিন যা সাহায্য করার করেছো, খবরদার আর নয়। ১৩ মে মরিচঝাঁপিতে নরক ভেঙ্গে পড়লো। গভীর রাত থেকে সেখানে শুরু হলো বর্বর এক নৃশংসতা। টানা তিনদিন চললো আক্রমণ। নৌকা করে লোক যখন পালাচ্ছে তখন তার ওপর লঞ্চ তুলে দেওয়া হলো। লাশগুম এবং নৌকা ভাঙার জন্য থাকলো আলাদা পুরষ্কার- নগদ টাকায়। লেলিয়ে দেওয়া পার্টিজান গুণ্ডারা ঘরে ঘরে আগুন দিলো, সামনে যে পড়েছে তার ওপর চললো আঘাত, নারী হলে তাকে হতে হলো ধর্ষিতা। আগুনে পুড়ে ছাই হলো শ’খানেক শিশু। তাদের তুলে আনার সময়টা দেওয়া হলো না মায়েদের। পলায়নপরদের ওপর গুলি চলছে পুলিশের। দুঃস্বপ্নের একাত্তরই ফিরে এলো মরিচঝাঁপির ওই বাঙালী রিফ্যুজিদের ওপর। তফাৎ এরা ধর্মেও এক, ভাষায়ও।

অবশেষে সাফ মরিচঝাঁপি। সম্পূর্ণ এলাকায় কোনো স্থাপনা নেই যা দাঁড়িয়ে আছে। ধংসস্তুপ কথাটার আক্ষরিক এক প্রদর্শনী চারদিক জুড়ে। পোড়া ছাইয়ের মাঝে হয়তো উকি মেরে আছে ঘুমের মধ্যেই লাশ হয়ে যাওয়া কোনো শিশুর রোস্ট। সরকারী নিষেধাজ্ঞার ঘেরে ক্যাজুয়ালটির সঠিক সংখ্যাটা এখনও অজানা। কারো মতো শয়ে শয়ে, কারো মতে হাজারে হাজার। লাশ জলে ভেসে গেছে, বাঘে খেয়েছে, তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ। সাংবাদিক তুষার ভট্টাচার্য্য তার এক প্রামাণ্যচিত্রে একটা হিসাব দিয়েছেন অবশ্য। ২৪ জানুয়ারি থেকে শুরু অবরোধ থেকে ১৩ মে পর্যন্ত অনাহারে ৯৪ জন এবং বিনা চিকিৎসায় ১৭৭ জন শিশু মারা গেছে। ধর্ষিতা নারীর সংখ্যা ২৪ জন, মারা গেছেন ২৩৯ জন। অনাহারে আত্মহত্যা করেছেন ২ জন। আহত ১৫০, নিখোজ ১২৮ জন এবং গ্রেফতার হয়ে জেলে গেছেন ৫০০ জন। অন্যান্য ভাষ্যে সংখ্যাটা কয়েকগুণ। এদের অনেকেই দন্ডকারণ্যে আবার ফিরে গেছেন। কেউবা পালিয়ে কলকাতায় এসে এখন ফুচকা বিক্রি করেন, হকারি করছেন। অনেকেই জানেন না তার স্বজনদের কে কোথায় আছে, বেচে আছে কিনা মরে গেছে। মেয়েরা হয়ে গেছেন পতিতা!

উদ্বাস্তুরা যখন মরিচঝাঁপিতে আশ্রয় নিয়েছিলো, তখন পশ্চিমবঙ্গের বাবুরা অনেকেই জানতেন না এসব খবর। কিন্তু অনেকেই জানতেন, খবর রাখতেন। আমি সম্মান করি কবি শঙ্খ ঘোষ ও কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় কে যাঁরা একাধিক কবিতা লিখেছেন। সন্মান করি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে যিনি একাধিকবার সশরীরে গিয়েছেন মরিচঝাঁপিতে, আনন্দবাজারে লিখেছেন তাদের দুর্দশার কথা। কিছু সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মীও ছিলেন উদ্বাস্তুদের পাশে।
কিন্তু জ্যোতি বসু সরকার একাই বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেলেন।

 

ধর্মের বলি হওয়া লাখো বাঙালির কান্নার মরিচঝাঁপি, জ্যোতিবসু সরকারের বিশ্বাসঘাতকতা আর নৃশংসতার মরিচঝাঁপি, বাঘের মতো মনোবল নিয়ে তবু বেঁচে থাকা বাঙালি হিন্দুর বার বার মাথা উঁচিয়ে দাঁড়াবার মরিচঝাঁপি, আমাদের খুব অন্তর্গত বেদনা, কান্না আর লজ্জার মরিচঝাঁপি।


সাতচল্লিশে ভারতে নমশূদ্ররা যায় নি। অধিকাংশই থেকে গিয়েছিল পাকিস্তানে। কী নির্মম নির্যাতন সহ্য করে থেকেছে–মারা গেছে–শেষ মেষ চলে গেছে ভারতে–মরিচঝাঁপির মত এলাকায়। একাত্তরে লবণহ্রদে এই নমশূদ্ররা পশুর চেয়েও অধম জীবন যাপন করেছে। তখন মৃত্যু ছিল নিত্যসঙ্গী।

নমশূদ্রদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে–সবাই। বৃটেন, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ– কে করে নি তাদের সঙ্গে অমানবিক ব্যবহার!

 

বাম রাজনীতিক জ্যোতি বসুতো সাম্যবাদী নেতা ছিলেন। এই ছিলো তাঁর সাম্যবাদের নমুনা।
আর আজ আপনাদের এবং আপনাদের দালাল কিছু বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়াদের থেকে মানবতাবাদ তথা ধর্মনিরপেক্ষতা শিখব ? আজ কানহাইয়া কুমার নামে একটা ভাঁড় কে মাঠে নামিয়ে ভাবছেন যে নিজেদের দলিত দরদী প্রমাণ করবেন। মানুষ এত বোকা নয়। কথায় আছে ধর্মের কল বাতাসা নড়ে। আজ দেখুন আপনাদের কি অবস্থা হয়েছে। সারা বিশ্ব তথা ভারতবর্ষ থেকে মুছে গেছেন। এই সবই পাপের ফল! সরি ও সব তো আপনার আবার মানেন না।


Spread the love

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *