হিন্দু বীর যোদ্ধা ,কাম, ক্রোধ, লোভ ত্যাগী নাগা সন্ন্যাসী

Spread the love

নাগা  সন্ন্যাসীদের কথা

মকর সংক্রান্তির পুণ্য তিথিতে সূর্য যখন মকর রাশির ওপর বিরাজ করছে প্রয়াগরাজের গঙ্গা যমুনা ও সরস্বতীর সংগমে একদল দিগম্বর সন্ন্যাসী “হর হর মহাদেব” ধনী দিতে দিতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দূর দূরান্ত থেকে আগত পূন্যার্থীরা সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে আছেন। হিন্দু ধর্ম মতে এ এক অতি পবিত্র মুহূর্ত। একদল উলঙ্গ সন্ন্যাসীর মহাস্নানের দ্বারা শুরু হল প্রয়াগ রাজের মহাকুম্ভ।

এই সব সন্ন্যাসীদের নিয়ে কয়েকশ বছর ধরে সাধারণ মানুষের মনে অনেক রকম প্রশ্ন আছে। আজ কলম ধরেছি ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায়কে পাঠকের সামনে তুলে ধরবো বলে। যাদের নগ্ন রূপ বহু মানুষের মধ্যে বিকৃত কিছু ধারনার জন্ম দেয়, সেই সব নাগা সন্ন্যাসীদের অদ্ভুত এবং অলৌকিক জীবনযাত্রাই আজকের লেখার বিষয়বস্তু।

এ প্রসঙ্গে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যযুগ ও আধুনিক ইতিহাস বিভাগের প্রধান প্রফেসর যোগেশ্বর তিওয়ারি বলেন, ভারতে যখন বকধার্মিকদের দৌরাত্ম্য প্রচণ্ড রূপ নেয় তখন তাকে রুখতে গুরু শংকরাচার্য একটি খারু গঠন করেন। ওই সঙ্ঘের মাধ্যমেই নাগাদের পত্তন হয়। শাস্ত্রজ্ঞান ও অস্ত্রজ্ঞান- উভয় বিষয়েই এই নাগারা বিজ্ঞ ছিল। এই দুয়ের প্রয়োগে তারা তখন সনাতন ধর্মের ওপরে যে বিপত্তি নেমে এসেছিল তার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী মুসলিম শাসনকালেও এই সাধুরা স্বধর্ম রক্ষায় তৎপর ভূমিকা রাখে।

সনাতনীদের পবিত্র তীর্থ হরিদ্বারের এক নাগা সাধু বলেন, নাগা সাধু হচ্ছে ধর্মের সৈনিক।ধর্মের সৌনিক এই শব্দের মধ্যে একটু যেন অন্যরকম অর্থ লুকিয়ে আছে বলে মনে হয়।
সংসার জীবন থেকে অনেক দূরে, ঈশ্বর সাধনায় মগ্ন এবং শীত-গ্রীষ্ম সব ঋতুতেই শরীর থাকে উদোম- এমন হুলিয়া বলে দেয় যে এরা নাগা সন্ন্যাসী বা নাগা সাধু। উপমহাদেশে সনাতন ধর্মীয় বিভিন্ন তীর্থকেন্দ্রের আশপাশে বিশেষ করে কুম্ভ মেলায় প্রায়ই তাদের দেখা মেলে। চুলে জটাধারী, গায়ে ছাইভষ্ মাখা এই সন্ন্যাসীরা লোকালয়ে কমই আসে। কেউ কেউ এদের যোদ্ধা সন্ন্যাসী বলেন।

অনেকেই মনে করেন, তাদের কামবাসনা চরিতার্থ করার মাধ্যম অর্থাৎ লিঙ্গ যেহেতু অকেজো করে দেওয়া হয় সেহেতু তাদের শারীরিক শক্তি প্রবল হয়। তাই নাগা সন্ন্যাসীরা বেশ শক্তসমর্থ হয়ে থাকে।
কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না যে, নাগা সন্ন্যাসী শুধু পুরুষরা নন, মহিলারাও হয়ে থাকেন। নাগা সন্ন্যাসী হয়ে ওঠার আগে একজন মহিলাকে ৬ থেকে ১২ বছর ধরে ব্রহ্মচর্যের যাবতীয় নিয়ম মেনে চলতে হয়। তাতে যদি সফল হন, কেবল তখনই গুরুর নির্দেশে সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষিত হতে পারেন তিনি।গুরু একজন মহিলাকে নাগা সন্ন্যাসে দীক্ষা দেওয়ার পূর্বে তাঁর অতীত জীবন, পরিবার ও আত্মীয়-পরিজন সম্পর্কে ভাল করে খোঁজখবর নিয়ে নেন।নাগা সন্ন্যাসিনী হয়ে ওঠবার আগে একজন মহিলাকে তাঁর নিজের পিণ্ডদান ও তর্পণ সেরে নিতে হয়। সন্ন্যাস গ্রহণের আগে মহিলাদের মাথা নেড়া করতে হয়, এবং গঙ্গা স্নান সারতে হয়। সন্ন্যাসী-বৃত্তে নাগা সন্ন্যাসিনীদের সন্ন্যাসীদের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়। এবং কুম্ভমেলায় পুণ্যস্নানে পুরুষ সন্ন্যাসীদের সমান সুযোগ পেয়ে থাকেন সন্ন্যাসিনীরা। সন্ন্যাসে দীক্ষিত হওয়ার আগে একজন মহিলাকে প্রমাণ করতে হয় যে, তিনি ঈশ্বরেই সম্পূর্ণতা সমর্পিত, এবং পার্থিব বাসনা-কামনায় তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। পুরুষ সন্ন্যাসীদের সঙ্গে সন্ন্যাসিনীদের পার্থক্য রয়েছে কেবল একটি জায়গাতেই, তাঁরা সন্ন্যাসীদের মতো নগ্ন হয়ে থাকেন না। বরং তাঁদের ক্ষেত্রে নিয়ম হল, হলুদ একটি কাপড় দিয়ে আবৃত রাখতে হবে শরীর। এমনকি, পুণ্যস্নানের সময়ও নগ্ন হওয়ার অধিকার তাঁদের নেই। যেহেতু তাঁদের জীবন সম্পূর্ণতা ঈশ্বরে সমর্পিত সেহেতু তাঁদের দিন শুরু হয় ঈশ্বর আরাধনার মাধ্যমে, এবং দিন শেষও হয় ঈশ্বরচিন্তা দিয়ে। নাগা সন্ন্যাসিনীরা তাঁদের কপালে লাগান টিকা, এবং এক টুকরো সেলাইহীন কাপড় দিয়ে আবৃত রাখেন শরীর। কজন নাগা সন্ন্যাসিনীকে সন্ন্যাসী-বৃত্তে ‘মা’ বলে সম্বোধন করা হয়।


কুম্ভ তো শুধু স্নান নয়, সাধুদের উৎসব। প্রতি চার বছর অন্তর কুম্ভে আখড়ার পদাধিকারীদের নির্বাচন হয়। কে হবেন শ্রীমোহান্ত বা প্রধান, কে হবেন আখড়ার ট্রেজারার বা ‘কারোবারি’ সবেরই নির্বাচন এই কুম্ভে। মোহান্ত, কারোবারি ছাড়াও নির্বাচিত হন ‘কোতোয়াল’ ও ‘পূজারি’।
পূজারির কাজ পুজো করা। কোতোয়াল আখড়ায় শান্তিরক্ষা করেন, সাধুদের বিবাদ-বিসংবাদ মেটান। আমাদের, সাধারণ মানুষের মতোই সামাজিক ব্যবস্থাপনা। আখড়ার প্রধান সন্ন্যাসীরা মনে মনে বিমুক্ত হলেও নাগাবেশ ধারণ করে থাকেন না।
নাগা সন্ন্যাসীদের এক-একটি আখড়ায় এক-এক জন ইষ্টদেবতা। নিরঞ্জনী আখড়ার ইষ্টদেব হলেন কার্তিকেয়। বাঙালির শৌখিন, ফ্যাশনদুরস্ত কার্তিক ঠাকুর নন, দেব সেনাপতি কার্তিকেয়। জুনা আখড়ার ইষ্টদেব মহাযোগী দত্তাত্রেয়। ইনি রুদ্রের আর এক রূপ। আনন্দ আখড়ার ইষ্টদেব সূর্য, অটল আখড়ার গণপতি।

এবার আলোচনা করা যাক বাল নাগা সন্ন্যাসীদের নিয়ে। কি এই মায়াবী জগত? কোন দুনিয়া থেকে এরা মাঝে মাঝে সাধারণ মানুষের মাঝে দেখা দেয়? আমরা নাগা সন্ন্যাসীদের তো দেখেছি, যারা ভয়ঙ্কর ঠান্ডার মধ্যেও উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু তাদের অলৌকিক আশ্চর্য জগত সম্পর্কে কতটাই বা জানি ? প্রচন্ড গরমের মধ্যেও যারা সারা শরীরে ভস্ম মেঝে মাথায় জ্বলন্ত হাড়ি নিয়ে তপস্যা করেন, কি এই সন্ন্যাসীদের জীবনের রহস্য? কুম্ভ মেলাতে আমরা অস্ত্রধারী উলঙ্গ এই সাধুদের দেখলেও বালক নাগা সন্ন্যাসীদের সেই অর্থে দেখা মেলে না।বালক নাগাদের অদ্ভুত জগতের কিছু তথ্য এবার তুলে ধরবো। আমাদের মনে বহু প্রশ্ন জাগে, নাগা সন্ন্যাসীদের এই আশ্চর্য জগতে কি করে প্রবেশ হয় এই সব বাল নাগাদের ? নিরীহ শিশুরা কি করে নাগা সন্ন্যাসীদের মতন তপস্যা করে ? মোমের মতন নরম শরীরকে কি করে ইন্দ্রের বজ্রের মতন তৈরি করে এইসব নাগারা ? নাগা সন্ন্যাসীদের কাছ থেকে কোন পরিবার উপকৃত হলে তারা অনেক সময় মানত করেন যে তাদের প্রথম সন্তান তারা এই সন্ন্যাসীদের দান করবেন। সেই ক্ষেত্রে শিশুর জন্মের পর সেই শিশুকে নাগা সন্ন্যাসীদের হাতে দিয়ে দেওয়া হয় এবং তারা সেই শিশুটির পালন পোষণ করেন। এই সব শিশুদের শৈশব থেকেই শাস্ত্র এবং অস্ত্র শিক্ষা শুরু হয়ে যায়। সেই সাথে থাকে ত্যাগ ও কঠোর তপস্যার শিক্ষা। এরা অস্ত্রচালনায় পারদর্শী হন। তারা দুই হাতে তলোয়ার, ত্রিশূল এক সাথে নিয়ে যুদ্ধ করতে পারে, শুধু তাই না লাঠি-চালনায় এরা পারদর্শী হয়।


বাল নাগাদের তৈরির প্রক্রিয়া খুব গোপনীয় হয়। কিন্তু নাগা সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য বেশ কিছু কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ১২ বছর অব্দি কঠোর প্রশিক্ষণ চলে, এই সময় নিজেদের খাদ্য নিজেদের তৈরি করতে হয়। তাছাড়া নিজের গুরুর সেবা তাদের করতে হয়। প্রশিক্ষণ চলাকালীন কোন ভুল হলে তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়। একজন মানুষের নাগা সন্ন্যাসী হতে ২০ বছর সময় লাগে। আট বছর বয়স হলে প্রতিষ্ঠানের মহাত্মারা এই সব শিশুদের কাছে লাখ লাখ টাকার দায়িত্ব দিয়ে পরীক্ষা করেন। এই পরীক্ষায় পাশ করলে তাঁকে একটা ছোট্ট মন্ত্র দেওয়া হয়। এরপর ১২ বছর বয়সে তার আসল প্রশিক্ষণ শুরু হয়। বাল নাগাদের প্রশিক্ষণ অনেকটা সেনার জবানদের মতন হয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে তাদের অটল থাকতে সবে এবং প্রয়োজনে মাতৃভূমি এবং সমাজের জন্য অস্ত্র ধারণ করতে হবে। নাগা সন্ন্যাসীরা মনে করেন সন্ন্যাসীদের নিজের কোন সংসার থাকে না, তাই তারা নিঃস্বার্থভাবে মাতৃভূমি এবং সমাজের সেবা করতে পারেন। কিন্তু সব সন্ন্যাসীরা নাগা নয়। এদের মধ্যে ভাগ আছে। এদের তিনটি ভাগ আছে, নাগা, তান্তোরা এবং নির্বাণ। বাল নাগা সাধু এই তিন শ্রেণীর যেকোনো একটির দীক্ষা নিতে পারে। এ এমন এক আধ্যাত্মিক জগত যার ধারের কাছে সাধারণ মানুষ পৌঁছতে পারে না। চারটি কুম্ভের পর ব্রম্ভচারি বালকদের নাগা সন্ন্যাসের দীক্ষা দেওয়া হয়, তারপর তাদের যৌনাঙ্গকে বিশেষ উপায়ে নষ্ট করে দেওয়া হয়। এরা সারা জীবন তেল আর সাবান লাগাতে পারেন না। এরা সারা শরীরে ভস্ম মেখে রাখে। যেকোনো খাদ্য যা শরীরে উত্তেজনা তৈরি করে, এইসব খাদ্য থেকে এরা দূরে থাকেন। ব্রহ্মমুহুর্তে তাদের মন্ত্রদান করা হয়। এই মন্ত্র এক সাধনা।বলা হয় এই সন্ন্যাসীরা যে ভস্ম শরীরে মেখে রাখে, এই ভস্ম তাদের বিষাক্ত সাপ, মশা এসবের হাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু এই ছাইয়ের মধ্যে গোবর,বেলপাতা, কলা সহ আরও অনেক কিছু মেশানো থাকে। এর মধ্যে কাচা দুধ মিশিয়ে এক মিশ্রণ তৈরি করে তা তারা শরীরে মাখে। এরা ব্রহ্ম মুহূর্তে ঘুম থেকে ওঠেন। তারপর হবন, ধ্যান,বজ্রোলি, প্রানায়ম, কপাল ক্রিয়া আর নৌলি ক্রিয়া করেন।
নাগা সাধু দিগম্বর অখিলেশপুরী বলেন বলেন, আমাদের লিঙ্গ অকেজো করে দেওয়া হয়। আমাদের কোনো কামনা-বাসনা থাকে না। যারা যৌন কামনার প্রবল বেগকে সামলে নিতে পারে তারাই নাগা।কাম, ক্রোধ, লোভ সেই সিদ্ধি লাভ করে যে যৌন বাসনার বিরুদ্ধে জয়ী হয়।

নাগা অর্থ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃত সত্য সন্ধান করে যে। এ ধরনের ব্যক্তিদের সাংসারিক জীবন থেকে দূরে থাকতে হয়। তাদেরকে ত্যাগের প্রতীক বলে মান্য করে ভক্তরা।


Spread the love

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *