করোণা নিয়ে জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর

Spread the love

।।করোণা নিয়ে ১০ টি বহু জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর ।।

আমাকে পরিচিত অনেকেই করোণা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করছেন। যে প্রশ্নগুলো হয়ত অনেকের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে। আমি কোষ ও আণবিক জীববিদ্যার গবেষক, ভাইরাস নিয়ে কিছু কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও তা খুব বেশি আমি বলব না । তাও যে প্রশ্নগুলো আমায় মোটামুটি সবাই করছে, আমি সাধ্যমত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্য ও প্রবন্ধ পড়ে দেবার চেষ্টা করছি। যদি আর কোন প্রশ্ন কারো মনে জাগে আমায় পাঠাতে পারেন। আমি পড়াশুনো করে উত্তর দেবার চেষ্টা করব।

প্রশ্ন ১: করোণার কোন চিকিৎসা কি একেবারেই নেই ?

করোণা ভাইরাস আগেও মানুষকে আক্রমণ করেছে। যেমন- SARS-Cov বা MERS-Cov। কিন্তু এই COVID-19 করোণা ভাইরাসটি নতুন ভাইরাস। তাই এর এখনো পর্যন্ত এর কোন ওষুধ বা প্রতিষেধক বাজারে নেই।

প্রশ্ন ২: কিন্তু আমেরিকা যে প্রতিষেধকের কথা বলছে ?

প্রতিষেধক বানানো এখন খুব বড় কোন ব্যাপার নেই উন্নত বায়োপ্রযুক্তি দ্বারা। কিন্তু আদতে সেটা কতটা কার্য্যকারী, তা বুঝতে গেলে মানুষের ওপর প্রয়োগ করে দেখতে হবে। সেটা করতে এবং তার তথ্য পেতে কমপক্ষে দেড় দু বছর লাগবেই।

প্রশ্ন ৩: কোন ওষুধই কি নেই ?

কয়েকটি সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে কোষে এই ভাইরাস সংক্রামিত করে দেখা গেছে, ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড়্রক্সি-ক্লোরোকুইন ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্য্যকারী। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ কৃত্রিম ব্যবস্থায় দেখা। মানুষের ক্ষেত্রে কি হবে বা তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই বা কি, তা এখনো অজানা। খুব বেশি তাই এখনই আশাবাদী হওয়া যাচ্ছেনা। আর আজিথ্রোমাইসিনের ব্যাপারটা ফ্রান্সে ব্যবহার হচ্ছে বলে খবরে পড়লাম। কিন্তু এখনো করোণার ক্ষেত্রে কার্য্যকারীতা সম্পূর্ণ কিছু জানা যায়নি। তাই এই নিয়ে এখনই সিদ্ধান্তে আশা মুশকিল। চীনে জাপানিজ ফ্লুর দুটি ওষুধ ব্যবহৃত হয়েছিল কিছু রোগীর ওপর, কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোন ফল পাওয়া যায়নি। তাই ওষুধ খাবার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা উচিত। আমেরিকার অ্যারিজোনায় একজন করোনা আটকাতে নিজে নিজে ক্লোরোকুইন খেয়ে, শেষে মারা গেছে, তাই এ ধরণের পদক্ষেপ না নেওয়াই ভাল। হিতে বিপরীত হতে পারে।

প্রশ্ন ৪: কিউবা না কি ইন্টারফেরণ নামে কিছু একটা অনাক্রম্যতা বৃদ্ধির ওষুধ আবিষ্কার করেছে ?

কিছু কিউবান সংবাদপত্রে তা দেখলাম। সত্যাসত্য বলা মুশকিল। আমাদের দেহের কোষ যদি ভাইরাসের DNA বা RNA চিনতে পারে, তবে ইন্টারফেরণ নিঃসরণকারী পথ সক্রিয় হয় এবং বিভিন্ন ইন্টারফেরণ নিঃসৃত হয়, এর ফলে অন্যান্য প্রতিরোধকারী কোষ (immune cell) সক্রিয় হয় আর তারা অকুস্থলে পৌঁছে সংক্রমিত কোষকে এসে মেরে ফেলে, গিলে ফেলে। আগে MERS-Cov নামে আরেকটি করোনা ভাইরাস ঘটিত রোগের ক্ষেত্রে অন্যান্য ওষুধের সাথে ইন্টারফেরণ মিশিয়ে উপকার পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু COVID-19 এর ক্ষেত্রে সেটা কতটা কার্য্যকরী প্রমাণিত নয়। পড়লাম কিউবা নাকি চীনকে পাঠিয়েছে। কি ফল হয়েছে, পরে জানা যাবে। ইন্টারফেরণ বেশি নিঃসৃত হলেও বেশি প্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া (immune response) সৃষ্টি হবে, যা রোগীর জন্যে ক্ষতিকর।

প্রশ্ন ৫: এই ভাইরাস পরবর্তী কালে আবার ফিরে এলে কি কম ক্ষতিকর হিসেবে দেখা দেবে ?

কিছু মানুষের মধ্যে এর প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হবে সেটা একটা দিক, বিশেষতঃ যারা একবার আক্রান্ত হয়েছেন। ভাইরাসের বিবর্তনের একটা তত্ত্ব আছে। এই ধরণের RNA ভাইরাস সব সময় নিজেকে বদলায় বা মিউটেট করে। ভাইরাস কখনোই চায়না আক্রান্ত মরে যাক, তাহলে ভাইরাস থাকবে কোথায়! সেজন্য ভাইরাস চেষ্টা করে আক্রান্ত যত কম asymptomic বা রোগ লক্ষণ কম হয়। সেই তত্ত্বে এটা হওয়া সম্ভব, যে করোনা সেভাবে নিজেকে পরিবর্তিত করল । কিন্তু কবে হবে সেটা বলা মুশকিল বা আদৌ এক্ষেত্রে হবে কিনা। কারণ করোনার RNA র দৈর্ঘ্য অনেক বড় অন্যান্য RNA ভাইরাসের তুলনায়, তাই মিউটেশান রেটও বা বদলানোর গতি অনেক মন্থর । আর করোনা যে ব্যবস্থায় তার RNA র প্রতিলিপি তৈরি করে (অর্থাৎ ১ থেকে ২, ২ থেকে ৪, ৪ থেকে ৮ ইত্যাদি) , সেই ব্যবস্থায় মিউটেশানকে চেনার আর আটকাবার ব্যবস্থা আছে ( proof-reading activity), তাই সেটা কতটা ঘটবে , সময় বলবে। তাছাড়া এই করোণা আবার অন্য কোন করোণার সাথে মিশে (recombined) নতুন কোন রূপে ফিরবে কিনা, সেটাও বলা সম্ভব নয়। যেমন H1N1 ইনফ্লুয়েঞ্জার ক্ষেত্রে হয়েছে।

প্রশ্ন ৬:এই ভাইরাস কতদিন চলবে ? কেউ কেউ বলছেন ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে এটা ছড়াতে পারে না।

সিঙ্গাপুরে কিন্তু এখন গড় তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে, কিন্তু সেখানে কিন্তু এখনো করোনা সংক্রমণের খবর আসছে। তাই গরম পড়লে ভাইরাসের প্রকোপ কমে যাবে, সে বিষয়ে আশার আলো দেখা যাচ্ছে বলে তো মনে হচ্ছে না ।

প্রশ্ন ৭: অনেকে বলছেন জল দিয়ে হাত ধোয়াই যথেষ্ট, তাহলে সাবান দিয়ে হাত ধোব কেন ? alcohol দেওয়া হ্যান্ড স্যানিটাইজার যদি না পাই, তাহলে কি করব ?

করোনা ভাইরাসের গায়ে স্নেহ পদার্থ বা ফ্যাটের একটা স্তর থাকে, যায়ে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় envelope বলে (ছবিতে আছে)। হাতে বা জামা-কাপড়ে তেল (ফ্যাট) লাগলে আমরা যেমন সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলি, সেভাবেই সাবানে এই ফ্যাটের envelope ধুয়ে যায়, ফলে ভাইরাস আর বাঁচতে পারেনা। জলে যেমন তেলের দাগ বা হাতের তেল দূর হয়না, একি নিয়মে ভাইরাসের কোন ক্ষতি হয়না। তাই সাবান প্রয়োজন।
Alcohol ( ৬০% এর বেশি মাত্রার) হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ব্যবহার করলে ভাইরাস নষ্ট হয়ে যায়। তাই বলে alcohol পান বা গায়ে ঢালার সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। Alcohol না থাকলেও সাবানই যথেষ্ট। আর alcohol মুক্ত স্যানিটাইজার ব্যবহার করাও যা না করাও তা এই ক্ষেত্রে।

প্রশ্ন ৮: এরকম বদ্ধ জীবন কদিন চালাতে হবে ?

এটা বলা খুব মুশকিল। ভাইরাসের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য জীবদেহে প্রবেশ করে। যদি সে প্রবেশ করতে না পারে, তবে তার আর ১ থেকে ২, ২ থেকে ৪, ৪ থেকে ৮ ইত্যাদি হওয়া হয়ে ওঠেনা। শরীরের অনাক্রম্যতা বা immunity বাকি ভাইরাসকে নষ্ট করে ফেলে। তাই যতক্ষণ না ভাইরাসের একজনের দেহ থেকে অন্য দেহে যাবার ব্যবস্থাটা সম্পূর্ণ আটকানো যাচ্ছে ততদিন এটা বলা অসম্ভব। ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখা ( social distancing ) ও সম্পূর্ণ lock-down ছাড়া এটা সম্ভব নয়। অন্ততঃ এই মুহুর্তে আর কোন পথ তো দেখা যাচ্ছেনা। তাই কষ্ট হলে এটায় মানিয়ে নিতে হবে। দেখা যাচ্ছে, এই ভাইরাস প্রতি ১ জন থেকে আড়াই জনে অর্থাৎ ২ জন থেকে ৫ জনে ছড়ায় । অর্থাৎ সেই ৫ জন থেকে ৫৬ জন, সেই ৫৬ জন থেকে ২৩৪৭০ জন, এরকম চলতে থাকবে, এবং তা খুব দ্রুত, যদি না সংক্রমণের এই গতিটা আটকানো যায়, তবে তার ফল মারাত্মক হতে পারে।

প্রশ্ন ৯: শুনছি চিনে বাদুড় থেকে এই রোগ এসেছে। আমরা কি তাহলে এই রোগ আটকাতে নিরামিষ খাব ?

এটা খুব সম্ভবত বাদুড় থেকে প্যাঙ্গোলিন বা পিপীলিকাভুক হয়ে মানুষে এসেছে। যখন মানুষে এসেছে, অনেক পরিবর্তনের মাধ্যমে এসেছে, এখন এটা মানুষের ভাইরাস, অন্য জীবের নয়। মানবদেহের কোষই এর আশ্রয়। তাই অন্য কোন কিছুর থেকে নয় , মানুষে মানুষে সংযোগেই এই ভাইরাস ছড়াবে। তাই মুরগী বা অন্য মাংসে ভয়ের কিছু নেই। ভাল করে বেশি তাপে রান্না করলেই চলবে। যদিবা অন্য কোন মানুষের হাঁচি কাশির মাধ্যমে আসা ভাইরাস মাংসে লেগেও থাকে, যেটা সবজির ক্ষেত্রেও সম্ভব, ওই তাপে ভাইরাসের আর বাঁচার কোন সম্ভাবনাই নেই।

প্রশ্ন ১০: এই ভাইরাস কি ল্যাবে কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা হয়েছে? এটা কি ষড়যন্ত্র ?

চীন থেকে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে এবং চীনের বন্য পশুর যে মাংসের বাজার সেখান থেকেই ছড়িয়েছে, এই নিয়ে বিশেষ কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু এর পেছনে কোন ষড়যন্ত্র আছে, সে সম্ভাবনা সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা লিখিত ভাবে নাকোচ করেছেন। এর আগেও চীনদেশেই বাদুড় থেকে ভাম বেড়াল হয়ে মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাস এসেছিল (SARS) ২০০২ সালে, মধ্যপ্রাচ্যে ২০১২ সালে অন্য একটি করোনা এসেছিল বাদুড় হয়ে উটের মাধ্যমে মানুষে (MERS)। SARS বা COVID-19 এর ক্ষেত্রে বন্য পশু বাজার দায়ী থাকলে, MERS এর ক্ষেত্রে সেরকম কিছু বলা যায়না। বন্য পশুর বাজার, (যা চীন সরকার বন্ধ করে দিয়েছে) দুই ক্ষেত্রে দায়ী হলেও, এতে ষড়যন্ত্র কিছু নেই। বিভিন্ন বন্য প্রাণ পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর ভাবে খাঁচায় রাখার জন্য এক প্রাণীর থেকে অন্য প্রাণীতে ছড়িয়েছে, সেখান থেকে মানুষে। যদিও মূল ভাইরাস ততদিনে নিজেকে পরিবর্তিত করে মানুষের উপযোগী করে ফেলেছে। প্রকৃতিকে প্রকৃতির মত থাকতে দেওয়া উচিত, তাহলেই আমরা সুরক্ষিত থাকব, এ সম্বন্ধে কোন দ্বিমত নেই। আশা রাখি, এই বন্য পশুর বাজার নিয়ে চীন সরকার ভবিষ্যতেও কড়া পদক্ষেপ নেবে ও এই বাজার চিরতরে বন্ধ করা হবে।

*        যাঁরা এই দশটা প্রশ্নোত্তর পড়লেন ধৈর্য্য নিয়ে তাঁদের মনে আশা করি নুন গরম জলে, পেঁয়াজ খেলে বা গোমূত্র পান করলে করোনা সারে কিনা ইত্যাদি নিয়ে কোন সংশয় নেই। যদি এখনো থাকে তাহলে বলব, এগুলোর পেছনে কোন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান বা গবেষণা করা হয়নি। তাও যদি আপনি নিজের ওপর বা পরিবারের লোকের ওপর তা প্রয়োগ করতে চান নানা লোকের কাছে শুনে, তার সিদ্ধান্ত ও দায় সম্পূর্ণ আপনার। তবে নিজের ওপর যাই প্রয়োগ করুন , অবশ্যই বাড়িতে থেকে করুন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে করুন। ভাল থাকবেন।

নির্মাল্য দাশগুপ্ত, PhD
কোষ ও আণবিক জীববিদ্যা গবেষক
ক্যালিফোর্ণিয়া, USA


Spread the love

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *